গত ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার ঋণের প্রতিশ্রুতির চেয়ে ১০০ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ সময়ে সুদ ও আসলের কিস্তি দিতে হয়েছে ৩৮০ কোটি ২৩ লাখ ডলার। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ৩৫০ কোটি ৭১ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের হার বেড়েছে ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) গতকাল জুলাই-এপ্রিলের বিদেশী ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে এ চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ে ঘাটতি থাকলেও সুদাসলসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে; যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। তাই ভবিষ্যতে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করে সুশাসন নিশ্চিত করার পরামর্শ তাদের।
ইআরডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বিদেশ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৮০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৬৫ কোটি ঋণ ও ১৫ কোটি ডলার অনুদান। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), যার পরিমাণ প্রায় ১২৭ কোটি ডলার। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ৪১ কোটি ডলার ও চীন ২৩ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যান্য দেশ ও সংস্থা থেকে এসেছে ৮৮ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি। বড় সহযোগী দেশ জাপান, ভারত, রাশিয়া ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। তবে এসব দেশ ও সংস্থা থেকে ঋণ ছাড় করা হয়েছে।
বিগত ১০ মাসে বিদেশী ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৪২৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৩৮৪ কোটি ডলার ঋণ ও ৩৯ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে আইডিএ; যার পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি ডলার। এ সময়ে রাশিয়া ৮২ কোটি, এডিবি ৭১ কোটি, চীন ৫৩ কোটি, জাপান ৪২ কোটি, ভারত ২৫ কোটি ডলার এবং অন্যান্য দেশ ও সংস্থা থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ডলার।
ইআরডির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭৮৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। কিন্তু অর্থবছরের ১০ মাস শেষে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে ৪২৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো ঘাটতি রয়েছে ৪৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৮০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে সরকার। এর মধ্যে বিদেশী ঋণের আসল ২৪৭ কোটি ডলার ও সুদ ১৩৩ কোটি ডলার। এ বছর একই সময়ে ঋণের প্রতিশ্রুতি ২৮০ কোটি ডলার এলেও আগের বছরে এসেছিল ৪২৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্ধেকেরও কম প্রতিশ্রুতি এসেছে।
বিদেশী ঋণ নেয়ার পাশাপাশি দেশী উৎস বিশেষত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেও ঋণ নেয়ার পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। অবশ্য কিছু ঋণ পরিশোধ করায় তা ৯৩ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বিদেশী ঋণের পাশাপাশি দেশী ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। কয়েক বছর ধরে বিদেশী ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে প্রতিশ্রুতির তুলনায় পরিশোধের অর্থ বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ বড় আকারের বাজেট ও পরবর্তী সময়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ। এছাড়া প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিদেশী ঋণ থাকায় সেটি পরিশোধ করতে হয়। দুই বছর ধরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশ ও সংস্থা বিনিয়োগ করছে না, ফলে প্রতিশ্রুতি কমেছে। বিনিয়োগ না থাকলেও আগের প্রকল্পগুলোর দেনা পরিশোধ করতে হচ্ছে। তবে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বছর শেষে এটি আরো বাড়বে।
ঋণের প্রতিশ্রুতির চেয়ে পরিশোধ বেশি করতে হলে সেটি উদ্বেগের। তবে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করে ঋণের অর্থে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এটি নেতিবাচক হবে না বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিদেশী প্রতিশ্রুতি কম আসার কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বল্প উদ্যোগ ও প্রকল্প কম নেয়ার প্রবণতা। ঋণ করলে ফেরত দিতে হবে সুদাসলে। কিন্তু পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়া উদ্বেগের। তবে ঋণের অর্থে প্রকল্প গ্রহণ ও ব্যয়ে অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধ করে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় এবং সেখান থেকে রিটার্ন আনা যায় তাহলে অবশ্যই পরিশোধটা আর বোঝা হবে না। এজন্য দেশে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’ সরকারকে ভবিষ্যতে এসব দিকে নজর দেয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।